জনতার কলম, আগরতলা, ২১ আগস্ট:-রাজ্যের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের জন্য বড়সড় স্বস্তির ঘোষণা করল ত্রিপুরা সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ত্রিপুরা বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক কমিশন (TERC) অনুমোদিত নতুন ট্যারিফের ফলে যে অতিরিক্ত মাশুলের বোঝা গ্রাহকদের উপর পড়েছে, তার ১০০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে রাজ্য সরকার নিজেই বহন করবে। বৃহস্পতিবার সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঘোষণা করেন রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী।
মন্ত্রী জানান, গৃহস্থালি গ্রাহক থেকে শুরু করে ছোট, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ী, কৃষক এবং শিল্প—রাজ্যের প্রায় সমস্ত শ্রেণির বিদ্যুৎ গ্রাহকই এই সুবিধার আওতায় আসবেন। তবে রেলওয়ে ট্র্যাকশন এই সুবিধার বাইরে থাকবে। পাশাপাশি ডিফেন্স ইন্সটলেশন, রেলওয়ে, অল ইন্ডিয়া রেডিও ও দূরদর্শনের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হবে।
ট্যারিফ নির্ধারণ করে TERC
বিদ্যুৎ মাশুল বৃদ্ধির প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুতের ট্যারিফ নির্ধারণ করে ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম (TSECL) বা রাজ্য সরকার নয়। বিদ্যুৎ আইন, ২০০৩-এর ৬১ ও ৬২ নম্বর ধারার অধীনে ট্যারিফ নির্ধারণের দায়িত্ব ত্রিপুরা বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক কমিশনের (TERC)। কমিশন একটি স্বাধীন আধা-বিচারবিভাগীয় সংস্থা।
TSECL তার ব্যয় ও প্রয়োজনীয়তার হিসাব দিয়ে কমিশনের কাছে পিটিশন জমা দেয়। এরপর জনশুনানি ও বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে TERC ট্যারিফ অর্ডার জারি করে। মন্ত্রীর দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন রাজ্যের বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক কমিশনকে তাদের নিয়ন্ত্রক ঘাটতি বা ‘রেগুলেটরি গ্যাপ’ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমন্বয় করতে হচ্ছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই চলতি অর্থবর্ষে ট্যারিফ সংশোধন করা হয়েছে।
বাম আমলের তুলনায় ট্যারিফ বৃদ্ধি কম, দাবি মন্ত্রীর
সাংবাদিক সম্মেলনে পূর্ববর্তী বামফ্রন্ট সরকারের সময়ের সঙ্গে বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুৎ মাশুল বৃদ্ধির তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরেন মন্ত্রী।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ সালে ট্যারিফ ৬২ শতাংশ, ২০১২-১৩ সালে ৭.৭৫ শতাংশ, ২০১৩-১৪ সালে ৪০.৪৫ শতাংশ এবং ২০১৪-১৫ সালে ৫.৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। ২০১০-১১ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত আট বছরে মোট ট্যারিফ বৃদ্ধি হয়েছিল ১১৬.০৩ শতাংশ বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, ২০১৮ থেকে ২০২৬-২৭ পর্যন্ত আট বছরে ট্যারিফ বৃদ্ধির হার ৪০.৪২ শতাংশ বলে জানান মন্ত্রী। তাঁর দাবি, ২০২০-২১ সালে ট্যারিফ বৃদ্ধির পরিবর্তে রিবেট দেওয়ার ফলে বিদ্যুতের মাশুল ২.৩৪ শতাংশ কমেছিল।
মন্ত্রী আরও দাবি করেন, ২০১০-১১ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের ক্রয়মূল্য বৃদ্ধির পর তৎকালীন সরকার ৬২ শতাংশ ট্যারিফ বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু ২০২২-২৩ সালে গ্যাসের ক্রয়মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও বর্তমান সরকার ট্যারিফ বৃদ্ধি করেনি।
Fixed Charge নিয়ে উদ্বেগের কথা স্বীকার
নতুন ট্যারিফ অর্ডার প্রকাশের পর স্থায়ী মাশুল বা Fixed Charge বৃদ্ধিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল বলেও স্বীকার করেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার মানুষের সেই উদ্বেগ বুঝেছে এবং বাড়তি বোঝা গ্রাহকদের কাঁধে না রেখে সরকার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মন্ত্রী জানান, বিষয়টি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ডঃ মানিক সাহা নিজে একাধিকবার আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিদ্যুৎ ট্যারিফ নিয়ে জরুরি বৈঠকে অংশ নিতে মুখ্যমন্ত্রী দিল্লি থেকে বিশেষভাবে রাজ্যে ফিরে এসেছিলেন বলেও সাংবাদিক সম্মেলনে উল্লেখ করেন তিনি।
মে মাস থেকেই কার্যকর, তিন মাসে হবে সমন্বয়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে মন্ত্রী জানান, এই ভর্তুকির সিদ্ধান্ত ২০২৬ সালের মে মাস থেকেই কার্যকর করা হচ্ছে। অর্থাৎ নতুন বর্ধিত ট্যারিফ অনুযায়ী যাঁরা ইতিমধ্যেই বিল পরিশোধ করেছেন, তাঁদের বাড়তি দেওয়া অর্থ নষ্ট হবে না।
আগামী সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের বিলের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সেই অতিরিক্ত অর্থ Adjust করা হবে। ফলে যাঁরা ইতিমধ্যে বর্ধিত হারে বিদ্যুৎ বিল মিটিয়েছেন, তাঁরাও এই সিদ্ধান্তের সুবিধা পাবেন।
সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় ১১৭ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা
মন্ত্রী জানান, রাজ্য মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্ধিত বিদ্যুৎ মাশুলের সম্পূর্ণ বোঝা বহন করতে রাজ্য সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয় হবে। ইতিমধ্যে নির্ধারিত ৭৭ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকার ভর্তুকির পাশাপাশি আরও ১১৭ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয় করবে রাজ্য সরকার।
তাঁর দাবি, ত্রিপুরার ইতিহাসে এই প্রথম কোনও সরকার বিদ্যুৎ মাশুল বৃদ্ধির সম্পূর্ণ বোঝা অর্থাৎ ১০০ শতাংশ ভর্তুকির মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে তুলে নিচ্ছে।
‘মানুষের সরকার’—বার্তা বিদ্যুৎমন্ত্রীর
সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষ, কৃষক, ছোট ব্যবসায়ীসহ প্রতিটি শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিলের বাড়তি বোঝা সরকার উপলব্ধি করেছে। মানুষের কষ্টের জবাব সরকার কথায় নয়, সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ মন্ত্রকে সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রী ডঃ মানিক সাহার নেতৃত্বে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর কথায়, “এই সরকার সংখ্যার সরকার নয়, মানুষের সরকার এবং গ্রাহকবান্ধব সরকার।”