ঝড়ে বিধ্বস্ত বিদ্যুৎ পরিকাঠামো, রাতদিন ময়দানে নিগম কর্মীরা— তদারকিতে মন্ত্রী রতন লাল নাথ

Date:

জনতার কলম ত্রিপুরা আগরতলা প্রতিনিধি :- প্রবল ঝড় ও টানা ভারী বৃষ্টিতে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ত্রিপুরার বিদ্যুৎ পরিকাঠামো। গত দুদিনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ছবি সামনে এসেছে। ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড (টিএসইসিএল)-এর প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যের আটটি জেলায় মোট ১,৬৬৫টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়েছে, ৭৪৫.৯৯ কিলোমিটার বিদ্যুৎ পরিবাহী তার ছিঁড়ে গিয়েছে এবং ১০৩টি ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফর্মার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৫৯ লক্ষ ২৪ হাজার ৫০০ টাকা।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলা। এখানে ৪৯৪টি বৈদ্যুতিক খুঁটি, ৯৬ কিলোমিটার তার এবং ১২টি ট্রান্সফর্মার নষ্ট হয়েছে। বিলোনিয়া, শান্তিরবাজার ও সাব্রুমে ঝড়ের ভয়াবহতার চিহ্ন স্পষ্ট। সিপাহিজলায় ২৬৮টি পোল, ৬১.৭৩ কিলোমিটার তার এবং ১৫টি ট্রান্সফর্মার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খোয়াইয়ে ২০৫টি পোল, গোমতীতে ১২৯টি পোল ও সর্বোচ্চ ১৯টি ট্রান্সফর্মার বিকল হয়েছে। উত্তর ত্রিপুরায় ১৭৩টি, উনকোটিতে ৫১টি এবং ধলাইয়ে ৮৫টি পোল ভেঙে পড়েছে। পশ্চিম ত্রিপুরা তথা আগরতলা-কেন্দ্রিক এলাকায় ২৬০টি পোল এবং ১৮৩.৯ কিলোমিটার তার ছিঁড়ে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

এই বিপর্যয়ের মাঝেই বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক করতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নেমেছে নিগমের কর্মীরা। কোথাও ঝড় থামার আগেই কাঁধে তার নিয়ে মাঠে নামতে দেখা গেছে লাইনম্যানদের, আবার কোথাও গভীর রাতে প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই ভেঙে পড়া খুঁটি প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল টিম উপড়ে পড়া গাছ সরিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধারে নিরলসভাবে কাজ করছেন। বহু জায়গায় টানা ২৪ থেকে ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে হয়েছে কর্মীদের।

নিগম সূত্রে জানা গেছে, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং জলাবদ্ধ এলাকায় পৌঁছতে গিয়ে কর্মীদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তবুও পরিষেবা দ্রুত স্বাভাবিক করতে তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিদ্যুৎ নিগমের ব্যবস্থাপনা অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসু জানান, এটি শুধু রিস্টোরেশন অপারেশন নয়, বরং মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার এক নিরন্তর লড়াই।

এই পরিস্থিতিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ। তিনি নিজে বিভাগভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট খতিয়ে দেখছেন এবং কোথায় কত দ্রুত পরিষেবা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, তার ওপর নিয়মিত নজর রাখছেন। নিগম কর্তৃপক্ষকে তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ— যত দ্রুত সম্ভব গ্রাহকদের বিদ্যুৎ পরিষেবা ফিরিয়ে দিতে হবে, এটিই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, কর্মীদের মনোবল বাড়াতেও এগিয়ে এসেছেন মন্ত্রী। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, এই কঠিন সময়ে রাজ্য সরকার বিদ্যুৎ নিগমের পাশে রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো দ্রুত পুনর্গঠনে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।

অন্যদিকে, নিগমের ব্যবস্থাপনা অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসুও মাঠে নেমে পরিস্থিতি তদারকি করছেন। আধিকারিক ও প্রকৌশলীদের নিয়ে তিনি একের পর এক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত পুনরুদ্ধারের রূপরেখা তৈরি করছেন। তাঁর এই সক্রিয় ভূমিকা নিগমের কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা জুগিয়েছে।

ক্ষতির আর্থিক পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। শুধুমাত্র বিদ্যুৎ পরিবাহী তার ক্ষতিতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭২ লক্ষ ৯৯ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া ভেঙে যাওয়া খুঁটিতে প্রায় ৮৩ লক্ষ ২৫ হাজার এবং ট্রান্সফর্মার ক্ষতিতে প্রায় ১ কোটি ৩ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

তবে এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। শহর থেকে গ্রাম— বহু এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, পানীয় জলের সংকট, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি এবং হাসপাতালসহ জরুরি পরিষেবায় বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। এই দুর্ভোগ লাঘব করতে বিদ্যুৎ নিগমের কর্মীরা যে নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিচ্ছেন, তা এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ এই কঠিন সময়ে সাধারণ মানুষের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, দুর্যোগের মধ্যেও মানুষ যেভাবে বিদ্যুৎ কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা প্রশংসনীয়।

সব মিলিয়ে, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় আবারও প্রমাণ করল— বিদ্যুৎ শুধু একটি পরিষেবা নয়, আধুনিক জীবনের অন্যতম ভিত্তি। আর সেই ভিত্তি পুনর্গঠনে যাঁরা দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করছেন, তাঁদেরই প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে রাজ্যের জনজীবন।

Share post:

Subscribe

Popular

More like this
Related

ঝড়-বৃষ্টির প্রভাব মোকাবিলায় তৎপর প্রশাসন, উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহার কড়া বার্তা

জনতার কলম ত্রিপুরা আগরতলা প্রতিনিধি :- সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিপাত...

তপশিলি সম্প্রদায়ের উন্নয়নে জোর, ভার্চুয়াল বৈঠকে মন্ত্রী সুধাংশু দাসের দিকনির্দেশ

জনতার কলম ত্রিপুরা আগরতলা প্রতিনিধি :- তপশিলি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের...

পেনশন বৃদ্ধির দাবিতে অবসরপ্রাপ্ত হোমগার্ডদের স্মারকলিপি, ডিজিপির আশ্বাসে আশার আলো

জনতার কলম ত্রিপুরা আগরতলা প্রতিনিধি :- পেনশন কাঠামোর আমূল...