জনতার কলম ত্রিপুরা আগরতলা প্রতিনিধি :- মহিলা, শিক্ষার্থী, যুব সম্প্রদায়, জনজাতি, তপশিলি জাতি, ওবিসি, সংখ্যালঘু, কর্মচারি, পেনশনার এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে এই বাজেট পেশ করা হয়েছে। এই বাজেট প্রমাণ করে আমাদের সরকার শুধুমাত্র কথায় নয়, কাজে বিশ্বাস করে। এই বাজেটটি আমাদের রাজ্যের বিকাশ, জনকল্যাণ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎকর্ষ সাধনের সম্ভাবনার প্রতীক। আমাদের সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিকশিত ভারত গড়ার যে লক্ষ্য এই বাজেট সেই লক্ষ্য পূরণের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা ত্রিপুরাকে আত্মনির্ভর করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছি। এই বাজেট তারই প্রতিফলন। আজ বিধানসভা অধিবেশনের দ্বিতীয়ার্ধে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে তার উপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা) মানিক সাহা একথা বলেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্য বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং গ্রামোন্নয়ন-এর উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এবারের বাজেটে নতুন কোনও কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়নি। ২০২৬-২৭অর্থবছরের মোট বাজেট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ২১২ কোটি ৩১ লক্ষ টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অনুমিত বাজেটের তুলনায় ৫.৫২ শতাংশ বেশি। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের জন্য ২,৪৪১.৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ২৫.২৯ শতাংশ বেশি। গ্রামীণ উন্নয়ন খাতে ৪,০৯৪.৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ২৫.২৯ শতাংশ বেশি। কৃষি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য ১,৯৮৫.৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ সালের তুলনায় ৫.৩১ শতাংশ বেশি। শিক্ষা খাতে ৬,৪৩৯.৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ সালের তুলনায় ৪.৪৩ শতাংশ বেশি। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে রাজ্য সরকার জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য মোট ৯১৪ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা প্রদান করবে। এখানে লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে আমাদের বাজেটের গত বছরের তুলনায় বৃদ্ধি ৫.৫২ শতাংশ কিন্তু আমরা জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের ক্ষেত্রে বাজেট গত বছরের তুলনায় ৬.৩৪ শতাংশ বেশি রেখেছি। ট্রাইবেল সাবপ্ল্যান অর্থাৎ টি.এসপির আওতায় মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৫৪২.০৬ কোটি টাকা, যা রাজ্যের মোট উন্নয়ন খাতের ব্যয়ের প্রায় ৩৯.৩৯ শতাংশ। ট্রাইবেল সাবপ্ল্যানের আওতাভুক্ত অধিকাংশ অর্থরাশি জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় ব্যয় হবে।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন দপ্তরের আগামী অর্থবছরে কি কি কাজ করা হবে বা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সমগ্র শিক্ষা অভিযানের অধীনে ১২৫টি নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, ৩৪৫টি শ্রেণিকক্ষ সংস্কার, ১০৫৬টি শৌচাগার নির্মাণ এবং ৪২৩৮টি নিরাপদ পানীয়জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পি.এম. পোষণ প্রকল্পে ৪ লক্ষ ১০ হাজার ছাত্রছাত্রীকে মিড ডে মিল দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যের জনগণের জন্য মানসম্মত সাশ্রয়ী ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা সুনিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার আওতায় ১ লক্ষ ১৪ হাজার ১৩২ জন রোগী ক্যাশলেস চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন। তাছাড়া মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনায় ৪৩ হাজার ৯৭৫ জন রোগী ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা গ্রহণ করেছেন। রাজ্যে ১১৩৯টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে ৫৯২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ন্যাশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স স্ট্যান্ডার্ডের অধীনে স্বীকৃতি লাভ করেছে, যা দেশের মধ্যে অন্যতম।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৪০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়নের কাজ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ৯৮০ কিলোমিটার জেলা সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়ন এবং ৮টি আর.সি.সি. সেতু নির্মাণের কাজ গ্রহণ করা হবে। রাজ্যের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সরকার কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তার বিস্তারিত তিনি বিধানসভায় উল্লেখ করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে প্রায় ৪ লক্ষ ৯২ হাজার গ্রামীণ মহিলা বর্তমানে ৫৫ হাজার ৩৫টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে সংগঠিত হয়েছেন। রাজ্যে ইতিমধ্যেই ১ লক্ষ ৮ হাজার লাখপতি দিদি হয়েছেন।
স্বসহায়ক দলগুলিকে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৮৯ কোটি টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে প্রায় ৩ লক্ষ ৪৭ হাজার মহিলা কৃষি, পশুপালন এবং মৎস্যচাষের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছেন। নারী ক্ষমতায়নকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে ক্লাস্টার লেভেল ফেডারেশনগুলির মাধ্যমে ৫৮টি জেন্ডার রিসোর্স সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যা নারীদের সহায়তা, সচেতনতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, এবছর ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত রাজ্যে ৪৫ হাজার ৮৫৪ জন গর্ভবতী মহিলাকে মুখ্যমন্ত্রী মাতৃপুষ্টি উপহার প্রকল্পে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় আরও ১০টি ওয়ার্কিং উইম্যান হোস্টেল নির্মাণের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ১১৪ কোটি টাকার প্রস্তাব সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার মঞ্জুর করেছে এবং হোস্টলগুলি নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট সমর্থন জানিয়ে আরও শক্তিশালী, সমৃদ্ধতর এবং বিকশিত ত্রিপুরা গড়ে তোলার লক্ষ্যে একসাথে কাজ করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী সবার প্রতি আহ্বান জানান।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বরাদ্দের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহরায় বলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত নির্মাণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে ত্রিপুরার উন্নয়নের যে রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে তা সফল করতেই রাজ্য সরকার কাজ করছে। বর্তমান অর্থবছরে রাজ্য সরকার কি কি কাজ করেছে এবং কি দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট তৈরি করা হয়েছে তা বাজেট বক্তব্যে তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর বাজেটে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ছে। আগামী অর্থবছরের জন্য ৩৪২১২.৩১ কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয়েছে। বাজেটে কোনও ধরনের কর চাপানো হয়নি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব নেওয়ার পর উত্তর পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে যে জোয়ার এসেছে তাতে আমাদের রাজ্যও অংশীদার। রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা রূপায়ণ করা হচ্ছে। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি রেল যোগাযোগ, সড়ক যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বর্তমানে ১৩টি এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করছে। ৬টি জাতীয় সড়ক এবং ৪টি রাজ্য হাইওয়ে রাজ্যে তৈরি হয়েছে। তাছাড়া রাজ্যের অন্যান্য সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, গৃহহীনদের জন্য আবাসন প্রভৃতির বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতি আগের তুলনায় অনেক সুদৃঢ় হয়েছে। কৃষকদের আয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেড়েছে।
আগে ছিলো না। রাজ্যের অভ্যন্তরীণ গড় উৎপাদন বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে। তিনি বলেন, রাজ্যের উন্নয়নে মূলধনী বায় তুলনামূলকভাবে অনেক বেড়েছে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, রাজ্যের বেকার যুবক যুবতীদের চাকরি দেওয়ার উদ্যোগ সব সময়ই অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই রাজ্যে প্রায় ৫৬ হাজার স্বসহায়ক দল তৈরি করা হয়েছে। প্রায় ৪ লক্ষ ৪৬ হাজার ৭৪৫ জন মহিলা স্বসহায়ক দলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এদের মধ্যে ১ লক্ষ ৮ হাজার জন লাখপতি দিদি হয়েছেন। নতুন নতুন ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে। তিনি বলেন, একদিনে সব কাজ করা সম্ভব না। এজন্য সময় দিতে হবে। ভবিষ্যতে রাজ্যের মঙ্গল হয় এই চিন্তা করেই আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট তৈরি করা হয়েছে।
সাধারণ বাজেট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আজ বিধানসভায় মৎস্যমন্ত্রী সুধাংশু দাস জানান, এই বাজেট জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, ২০৪৭সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ এবং ‘বিকশিত ত্রিপুরা’ গড়ার লক্ষ্যে এই বাজেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। পাশাপাশি তিনি প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে জানান, এই বাজেটের মাধ্যমে দপ্তরের বর্তমান প্রকল্পগুলি বাস্তবায়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী প্রাণী সম্পদ বিকাশ যোজনার মাধ্যমে রাজ্যের সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনার আওতায় মৎস্যচাষীরাও ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছেন, যার ফলে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটছে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও তিনি বাজেটে ‘অরেঞ্জ ইকোনোমি’র বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তাছাড়া আজ বাজেটের উপর আলোচনায় অংশ নেন বিধায়ক রঞ্জিত দাস, অশোক চন্দ্র মিত্র, ফিলিপ কুমার রিয়াং, সুদীপ রায় বর্মন, সুদীপ সরকার ও পল দাংশু।

Leave feedback about this