জনতার কলম ওয়েবডেস্ক :- ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং শনিবার বলেছেন, বর্তমান যুগে আত্মনির্ভরতা শুধু বিকল্প নয়, বরং দেশের টিকে থাকা ও অগ্রগতির জন্য একান্ত প্রয়োজন। সন্ত্রাসবাদ, মহামারী ও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষায় বিদেশি সরঞ্জামের উপর নির্ভরশীলতা আর গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তিনি স্পষ্ট জানান।
নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ‘Warfare in the 21st Century’ শীর্ষক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজনাথ সিং বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে আত্মনির্ভর ভারতের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মূল লক্ষ্য দেশের কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষা করা।
মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন ও প্রযুক্তি উন্নয়ন ছাড়া ভারতের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা সম্ভব নয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং দেশের সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্যের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ‘অপারেশন সিন্ধুর’ মাধ্যমে ভারতের ক্রমবর্ধমান দেশীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতার বাস্তব প্রমাণ মিলেছে। সম্পূর্ণ দেশীয় সরঞ্জাম ব্যবহার করে সুসমন্বিত পরিকল্পনায় এই অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজনাথ সিং বলেন, “ভারতের জয় এবং পাকিস্তানের পরাজয় হয়তো অনেকের কাছে স্বল্পকালীন যুদ্ধ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ও কৌশলগত পরিকল্পনা।” তিনি আরও যোগ করেন, অপারেশন সিন্ধুর সাফল্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর শক্তি, দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার প্রতিফলন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘সুদর্শন চক্র মিশন’-কে দেশের প্রতিরক্ষা ইতিহাসে এক রূপান্তরমূলক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আগামী এক দশকের মধ্যে সারা দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অঞ্চলগুলোকে পূর্ণাঙ্গ আকাশ প্রতিরক্ষা সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যেই এই মিশন নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ২০২৫ সালের ২৩ আগস্ট ডিআরডিও দেশীয় সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সফল পরীক্ষা চালিয়েছে, যেখানে একসঙ্গে তিনটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। রাজনাথ সিং বলেন, “এটি প্রধানমন্ত্রীর ভিশন বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ,” এবং তিনি আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেন যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দ্রুত এই পথে এগোচ্ছে।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয়করণে ভারত বড় সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশের সব যুদ্ধজাহাজ দেশেই তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি উন্নত অস্ত্র ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা-সজ্জিত স্টেলথ ফ্রিগেট আইএনএস হিমগিরি ও আইএনএস উদয়গিরি নৌবাহিনীতে যুক্ত হওয়া ভারতীয় নৌবাহিনীর আত্মনির্ভরতার অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। রাজনাথ সিংয়ের কথায়, “এই বিশ্বমানের যুদ্ধজাহাজ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের উপস্থিতি আরও সুদৃঢ় করবে।”
প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে বড় পদক্ষেপের ঘোষণা দিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তিনি জানান, অত্যাধুনিক শক্তিশালী অ্যারো-ইঞ্জিন তৈরির প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ এবং খুব শিগগিরই দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। অতীতের নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে উন্নত প্রতিরক্ষা উৎপাদনে এটি হবে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুতে গড়ে তোলা ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর আত্মনির্ভর ভারতের পথে উদ্ভাবন, উৎপাদন ও শিল্পগোষ্ঠী তৈরির মাধ্যমে এক ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রতিরক্ষা আমদানিকারক দেশ থেকে রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরই এখন ভারতের বড় সাফল্য। ২০১৪ সালে যেখানে প্রতিরক্ষা রপ্তানি ছিল ৭০০ কোটিরও কম, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪,০০০ কোটি টাকা। রাজনাথ সিং বলেন, “এই সাফল্যের পিছনে শুধু সরকারি সংস্থা নয়, বেসরকারি শিল্প, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তারাও সমানভাবে ভূমিকা রেখেছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, পজিটিভ ইন্ডিজেনাইজেশন লিস্ট অনুযায়ী আগে আমদানি করা ৫,৫০০-রও বেশি সামরিক সরঞ্জাম দেশেই তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে, যার মধ্যে ইতিমধ্যেই ৩,০০০-এরও বেশি আইটেম সফলভাবে দেশীয় উৎপাদনে রূপান্তরিত হয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, প্রতিরক্ষা এখন আর কেবল ব্যয় নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক শক্তিশালী স্তম্ভ। তিনি জানান, বর্তমানে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন ১.৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ২৫ শতাংশ অবদান এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। রাজনাথ সিংয়ের ভাষায়, “প্রতিরক্ষা খাত চাকরি, উদ্ভাবন ও শিল্পোন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে—যেমন আইটি বা অটোমোবাইল খাত।”
মন্ত্রী আরও জানান, প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়াতে সরকার একাধিক সংস্কার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করা, এফডিআই সীমা বাড়িয়ে ৭৪ শতাংশ করা এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিতে সরলীকৃত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কাঠামো। এছাড়া iDEX স্কিম দেশের তরুণ ও স্টার্টআপদের প্রতিরক্ষা খাতে নতুন উদ্ভাবনে উৎসাহিত করছে, ফলে বিদেশি প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের উপর নির্ভরশীলতা কমছে। রাজনাথ সিং বলেন, “আমরা আমাদের তরুণদের বলছি—তোমাদের উদ্ভাবন তুলে ধরো, সরকার পাশে থাকবে।”
ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান পুনরায় স্পষ্ট করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমরা কারও শত্রু হতে চাই না, তবে দেশের স্বার্থের ক্ষেত্রে কোনো আপস করব না। আমাদের মানুষের কল্যাণ, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর উন্নয়নই সর্বাগ্রে। যত বেশি চাপ বিশ্ব আমাদের উপর তৈরি করবে, ভারত ততটাই শক্তিশালী হয়ে উঠবে।”
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ, কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ২১শ শতক সবচেয়ে অস্থিতিশীল সময়গুলোর একটি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারতের জন্য টেকসই পথ একটাই—আত্মনির্ভরতা। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৯-২০ সালে যেখানে অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ডে ৩,০০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল, কর্পোরেটাইজেশনের ফলে সেটিই আজ ১,৬০০ কোটিরও বেশি মুনাফায় পরিণত হয়েছে। এটি ঔপনিবেশিক মানসিকতা ভেঙে বেরিয়ে আসার প্রতীক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নারী অফিসারদের যুদ্ধক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিশেষভাবে প্রশংসা করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, আজ ভারতীয় নারী সেনারা যুদ্ধবিমান ওড়াচ্ছেন, যুদ্ধজাহাজ পরিচালনা করছেন, আবার দুর্গম সীমান্তে দেশের সুরক্ষা দিচ্ছেন। ১৯৯৮ সালের পোখরান পরমাণু পরীক্ষার পর প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা অতিক্রম করে ভারত আজ নিজস্ব এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ার, ফাইটার জেট, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে—এর কৃতিত্ব সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপের ফল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকাও তুলে ধরেন রাজনাথ সিং। তিনি বলেন, “একটি ছোট রিপোর্ট কোটি মানুষের মনোবল বাড়াতে পারে, আবার সামান্য ভুলেই জীবনহানি ঘটতে পারে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদমাধ্যম জাতীয় নিরাপত্তার এক প্রহরী।”
Leave feedback about this