জনতার কলম ত্রিপুরা আগরতলা প্রতিনিধি :- ত্রিপুরা বিধানসভায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৩৪ হাজার ২১২ কোটি ৩১ লক্ষ টাকার বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী প্রাণজিৎ সিংহ রায় । এই বাজেটের আকার ২০২৫–২৬ অর্থবছরের অনুমিত বাজেটের তুলনায় ৫.৫২ শতাংশ বেশি। এবারের বাজেটেও নতুন করে কোনো কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়নি। তবে বাজেটে মোট আর্থিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ২৪০.৭২ কোটি টাকা।
বাজেট পেশের পর বিধানসভায় আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী জানান, রাজ্যের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে এবারের বাজেটে মূলধনী ব্যয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে মূলধনী ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯৪৫ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩.১৯ শতাংশ বেশি। তিনি বলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে “বিকশিত ভারত” গড়ে তোলার লক্ষ্য সামনে রেখে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সিথারামান যে বাজেট পেশ করেছেন, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজ্যেও “বিকশিত ত্রিপুরা” গড়ার রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।
বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে ২ হাজার ৪৪১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২৫.২৯ শতাংশ বেশি। গ্রামীণ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৯৪ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা, যা ১৭.৫০ শতাংশ বেশি। কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৬১ লক্ষ টাকা এবং শিক্ষা খাতে ৬ হাজার ৪৩৯ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা।
কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে ৬০টি নতুন গ্রামীণ বাজার নির্মাণ, ১০০টি কৃষক পরামর্শ কেন্দ্র, কৃষি উপবীজ সংরক্ষণাগার এবং ৩০টি কৃষক জ্ঞান কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পশ্চিম ত্রিপুরার মোহনপুরে একটি এগ্রিকালচার ফার্ম মেশিনারি প্রমোশন অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে। উদ্যানজাত পণ্যের বিপণন শক্তিশালী করতে রাজ্যের আরও ৩০টি স্থানে বাজার শেড নির্মাণ করা হবে।
পশুপালন ও মৎস্যখাতেও একাধিক প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে। অভয়নগর রাজ্য ভেটেরিনারি হাসপাতালে অ্যানিমেল পেট ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট ও ব্লাড ব্যাঙ্ক স্থাপন করা হবে। আগরতলায় পশু ও পোল্ট্রি খাদ্যের জন্য একটি ফিড অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে। গোর্খাবস্তিতে ত্রিপুরা স্টেট ফিসারিজ অ্যাওয়ারনেস সেন্টার এবং কুমারঘাট, কমলপুর, সাবুম ও বিলোনীয়ায় চারটি পিসসিকালচার নলেজ সেন্টার স্থাপন করা হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে ১২টি নতুন উচ্চ ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের পাশাপাশি ত্রিপুরা সরকারি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ত্রিপুরা সরকারি মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিলোনীয়ার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলেজ, করবুক সরকারি ডিগ্রি কলেজ, আগরতলার রামঠাকুর কলেজ ও ওল্ড আগরতলা সরকারি ডিগ্রি কলেজে নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে। রামঠাকুর কলেজে ১০০০ আসন বিশিষ্ট অডিটোরিয়ামও তৈরি করা হবে।
স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নে ধলাই জেলা হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ব্লক, তেলিয়ামুড়া, খোয়াই ও বিশ্রামগঞ্জে ট্রমা কেয়ার সেন্টার এবং জেলা ও মহকুমা হাসপাতালে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য (এমসিএইচ) উইং চালুর প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া এজিএমসি ও জিবিপি হাসপাতালে জেরিয়াট্রিক ও ডায়াবেটিক কেয়ার ইউনিট এবং কম্প্রিহেনসিভ ডে কেয়ার হিমোফিলিয়া ও থ্যালাসেমিয়া ম্যানেজমেন্ট সেন্টার স্থাপন করা হবে। ঊনকোটি জেলা হাসপাতালে ক্যান্সার ডায়াগনস্টিক ও ম্যানেজমেন্ট সেন্টারও তৈরি করা হবে।
এছাড়া বিভিন্ন উপজাতি এলাকার উন্নয়নের জন্য ট্রাইবেল মাল্টিপারপাস মার্কেটিং সেন্টার, ট্রাইবেল রেস্ট হাউস এবং এসটি ছাত্রদের জন্য নতুন হোস্টেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। খেলাধুলার উন্নয়নে বাধারঘাটের দশরথ দেব স্টেট স্পোর্টস কমপ্লেক্সে ৩০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন গ্যালারি নির্মাণ করা হবে এবং দক্ষিণ ত্রিপুরায় একটি সিন্থেটিক ফুটবল টার্ফ তৈরি করা হবে।
পর্যটন ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডুম্বুরে ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন, ট্যুইন আইল্যান্ড উন্নয়ন, অমরসাগর লেকে ওয়াটারফ্রন্ট উন্নয়ন এবং ব্রহ্মকুণ্ডের অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। আগরতলায় সাইবার সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার, আইটি ও ডাটা ইকোসিস্টেম জোন এবং আধুনিক আইটি পার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিটি জেলায় রিজিওনাল স্টার্ট-আপ হাব স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি “মুখ্যমন্ত্রী আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান প্রকল্প” চালু করা হবে, যার মাধ্যমে নার্সিং, আইটিআই, ডিপ্লোমা ও স্নাতক শিক্ষার্থীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। রামকৃষ্ণ মিশনের সহযোগিতায় আগরতলায় একটি ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুল এবং ড্রোন পাইলট প্রশিক্ষণের জন্য ড্রোন স্কুলও স্থাপন করা হবে।
সরকারের মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এবারের বাজেট প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।

